
ভূমিসেবা সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার একের পর এক ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করলেও দেশের বিভিন্ন ভূমি অফিসে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ থামছে না। নামজারি, খাজনা, জরিপ, মাঠ পর্চা ও রেকর্ড সংশোধনের মতো মৌলিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ভূমি অফিস ঘুরে নাগরিক হয়রানির নানা চিত্র উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ভূমি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট, যেখানে নিয়মের চেয়ে আর্থিক লেনদেন বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
রংপুরে একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মহানগরীর পার্বতীপুর মৌজায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনায় স্থানীয় ভূমি অফিসের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা রাখার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
এছাড়া সদর উপজেলার আলমনগর মৌজায় একই জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক নামজারি অনুমোদনের অভিযোগে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর সমাধান মেলেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুর জজ কোর্টের আইনজীবী ও মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ডলাশ কান্তি নাগ বলেন, “ভূমি অফিসের দুর্নীতি ও হয়রানি সাধারণ মানুষের জন্য বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।”
মেহেরপুরে চলমান ভূমি জরিপ কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। জমির মালিকদের দাবি, সামান্য অসঙ্গতির অজুহাতে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হচ্ছে। তবে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
গাংনী উপজেলার একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বহিরাগত ব্যক্তির মাধ্যমে ঘুষ আদায়ের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগে উৎসাহিত করা হয়।
তবে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানিয়েছেন, জেলার সব ভূমি অফিসে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দালালচক্র দমনে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বগুড়ায় ডিজিটাল সার্ভে বা জরিপ কার্যক্রম নিয়েও নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ভূমির মালিক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও বারবার নতুন কাগজ চাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কাগজে ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা, শুনানির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং রেকর্ড সংশোধনে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
বগুড়া শহরের মালগ্রাম এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ হেলাল অভিযোগ করেন, জমির খাজনা সংক্রান্ত কাজ করতে গিয়ে একাধিক দপ্তরে বারবার নতুন সমস্যা দেখিয়ে তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) কার্যক্রমকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি উদ্বেগও বাড়ছে। অনেক জমির মালিক অভিযোগ করেছেন, জরিপের সময় জমির সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও তদারকি না থাকলে ভবিষ্যতে নতুন করে জমি বিরোধ এবং মামলা বৃদ্ধি পেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই করা হয় এবং কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের জন্য আবেদনকারীকে অবহিত করা হয়।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশাসনিক খাতগুলোর মধ্যে ভূমি প্রশাসন অন্যতম। এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।
তাদের মতে, ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি দমন, দালালচক্র নির্মূল এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com