
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ‘সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প’ (রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট—RUTDP)-এর সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলীর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, কনসালটেন্ট নিয়োগে অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আর্থিক দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এদিকে অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) থাকা এই সাবেক প্রকল্প পরিচালককে পুনরায় একই প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর পিআরএল কার্যকর হয়। এরপর থেকেই তিনি পূর্বের পদে চুক্তিভিত্তিকভাবে ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসংক্রান্ত একটি ফাইল স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরইউটিডিপি (RUTDP) প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সড়ক, ড্রেনেজ, স্ট্রিট লাইটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ও বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রকল্পের চুক্তি ও কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী।
অভিযোগ রয়েছে, পিআরএলে যাওয়ার ঠিক আগে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ জন কর্মী নিয়োগে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, কার্যসহকারী, সমাজবিজ্ঞানী (সোসিওলজিস্ট) এবং হিসাব সহকারীসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পদভেদে কয়েক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে তার ভাই প্রকৌশলী মো. রাজুর মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক প্রার্থী অর্থ প্রদান করেও চাকরি পাননি।
প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী কনসালটেন্সি খাতে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বড় অঙ্কের কমিশন ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইফতিশা, অ্যাকুয়া কনসালটেন্সি, ডেপকো এবং ডিপিএম নামের চারটি প্রতিষ্ঠানকে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্বতন্ত্র কনসালটেন্ট নিয়োগেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক লাখ টাকা বেতনের এসব পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় একাধিক পদে বাস্তবে লোকবল নিয়োগ না দিয়েও ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে বেতন উত্তোলন করা হয়েছে।
এছাড়া ব্যক্তিগত কর্মচারীদের প্রকল্পভুক্ত দেখিয়ে সরকারি অর্থ থেকে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মধুমতি মডেল টাউনে একটি প্লট এবং সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করা হয়েছে।
এছাড়া তার ভাই প্রকৌশলী রাজুর নামেও একাধিক ফ্ল্যাট ও স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্রে জানা যায়, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পাশাপাশি আউটসোর্সিং নিয়োগ, কনসালটেন্সি নিয়োগ, পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন, নিয়োগবিধি এবং সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র এলজিইডির কাছে চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মঞ্জুর আলী এমজিএসপি প্রকল্পে ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্প সমাপ্তির পর উদ্বৃত্ত অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগেও অভিযুক্ত।
তবে এ বিষয়ে কোনো তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
সাবেক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাকে পুনরায় একই পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগে এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “যার বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগের তদন্ত চলছে, তাকে পুনরায় একই দায়িত্বে আনা হলে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।”
দুদকের উপপরিচালক আজিজুল হক বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আউটসোর্সিং ও কনসালটেন্সি নিয়োগসংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র এলজিইডির কাছে চাওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com