
কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামকে ঘিরে সম্পদ, প্রভাব এবং প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া একটি অভিযোগ এবং তার আয়কর নথিতে উল্লেখিত সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিচারিক বা প্রশাসনিক তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়নি, তবুও বিষয়টি জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার একটি শিক্ষক পরিবারে জন্ম নেওয়া আরিফুল ইসলাম ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরি জীবনে তিনি রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক সূত্রের মতে, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের আস্থাভাজন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ঘোষিত আয় এবং নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। এ অভিযোগের পর তার আয়কর নথি ও সম্পদের তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর হাউজিং এলাকায় একটি ফ্ল্যাট, পাইপাড়ায় জমি, উত্তর মেরাদিয়ায় প্লট এবং খিলগাঁও ও কাফরুল এলাকায় জমির তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ এবং স্বর্ণসম্পদের বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, এসব সম্পদের উৎস ও অর্জনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সম্পদ থাকা মানেই তা অবৈধভাবে অর্জিত—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। এ জন্য আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ এবং অন্যান্য আর্থিক উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অতীতে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা স্বাধীন যাচাই প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার কথিত প্রভাববলয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা তাকে প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। তাদের দাবি, এ কারণেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তবে এই দাবিরও স্বাধীন যাচাই হয়নি।
ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় তার কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন বিতর্কের জেরে তাকে এক পর্যায়ে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আসেনি। প্রশাসনে বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীকেন্দ্রিক সম্পদ গড়ে তুললেও নিজ জেলায় তুলনামূলকভাবে কম সম্পদ রেখেছেন তিনি। অভিযোগকারীদের ধারণা, এর মাধ্যমে প্রকৃত সম্পদের চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির সত্যতা নির্ধারণে বিস্তারিত তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা লাভ করেছেন এবং নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ অর্জন করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত বা তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দায়মুক্ত হতে পারেন, আবার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগে তার নিয়োগ প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ প্রভাব বা সুবিধা কাজ করেছিল কি না। তবে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এদিকে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে—যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়, তাহলে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করা হচ্ছে না কেন? আবার যদি অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি থাকে, তাহলে তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়? এই প্রশ্নগুলোই বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা বজায় রাখতে অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত।
অভিযোগকারীরা তার সম্পদ, ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ এবং আয়কর নথির তথ্য বিস্তারিতভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সম্পদের উৎস ও বাস্তব অবস্থার সঙ্গে নথিভুক্ত তথ্যের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে কোনো ব্যক্তি মন্তব্য না করলেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় না।
সবশেষে বলা যায়, মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত নয়। তবে অভিযোগের গুরুত্ব ও ব্যাপকতার কারণে বিষয়টি জনআলোচনায় স্থান পেয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্পদ, প্রভাব ও প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। ফলে এখন সবার দৃষ্টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com