
ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. খুরশীদ আলম, যিনি ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি তদন্ত প্রতিবেদন, বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে জানা গেছে, কেনাকাটা ও সংস্কারকাজে অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন কাজ খণ্ড-খণ্ডভাবে ভাগ করে নিজের অনুমোদন সীমার মধ্যে এনে টেন্ডার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এড়িয়ে যান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার বিভিন্ন কাজের মধ্যে অন্তত ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণকাজে ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৭৪১ টাকার ব্যয়ের বিপরীতে সরাসরি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ২৫ লাখ টাকার আসবাবপত্র কেনা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বাকি প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রকৃত আত্মসাতের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। তদন্তের বাইরে থাকা আরও প্রায় ৭০ লাখ টাকার কাজ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও জানা গেছে।
অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর খুরশীদ আলমকে ওএসডি করে ঢাকায় সংযুক্ত করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পর প্রধান কার্যালয়ের একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফা তদন্ত পরিচালিত হয়। উভয় তদন্তেই একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মিজানুর রহমান জোদ্দারকে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে খুরশীদ আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। লিখিত ও মৌখিকভাবে জবাব দেওয়ার সময়সীমা ছিল গত ১২ এপ্রিল। তবে তিনি সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় খুরশীদ আলম তার মেয়েসহ ৪০-৪৫ জন বন্ধুর রংপুর সফরের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিআইপি গেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের আপ্যায়ন বাবদ প্রায় ৩৩ হাজার টাকার বিলও বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে ওই অর্থ তার কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অফিসে দায়িত্ব পালনকালে খুরশীদ আলম ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের বিভিন্ন বিল উত্তোলনের দিনগুলোতেই এসব অর্থ জমা হতো।
তথ্য অনুযায়ী, খুরশীদ আলমের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখার হিসাবে প্রায় ৯০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং তার স্ত্রী আফরোজা আক্তারের হিসাবে প্রায় ২৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী কোনো কাজকে খণ্ড-খণ্ডভাবে ভাগ করা যাবে না। কিন্তু খুরশীদ আলম বিভিন্ন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে সম্পন্ন করেন।
রংপুর অফিসের গেট সংস্কার, গাড়ি পার্কিং এলাকা নির্মাণ এবং ভিআইপি গেস্ট হাউস সংস্কারসহ একাধিক কাজে ব্যয় অতিরঞ্জিত করা, নিম্নমানের কাজ এবং বাস্তবে কাজ না করেও বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একটি ক্ষেত্রে গাড়ি পার্কিং নির্মাণের নামে প্রকৃতপক্ষে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। এছাড়া ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খুরশীদ আলম। তিনি দাবি করেন, জরুরি প্রয়োজনের কারণে দ্রুত কাজ করতে গিয়ে নিয়মের কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। তার ভাষ্য, “এসব কাজের জন্য প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে দীর্ঘ সময় লাগত। তাই নিজের ক্ষমতার মধ্যে থেকে কাজ করেছি।”
তিনি আরও বলেন, একজন নির্বাহী পরিচালকের ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণেই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিনি প্রতিটি অভিযোগের জবাব দেবেন বলেও জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নজিরবিহীন। বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, “রংপুর অফিসে দায়িত্বকালীন অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com