
মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছাড়াই সরকারি কাজ বাস্তবায়ন, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন, স্বেচ্ছাচারিতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজে নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, গত কয়েক মাসে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের আওতায় অন্তত ১৯টি প্রকল্পে টেন্ডার ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। বরং নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে গোপনে কাজ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। অনেক শ্রমিকও জানাতে পারেননি তারা কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, অনেক কাজ রাতারাতি শুরু হয়েছে এবং দ্রুত শেষও করা হয়েছে।
অভিযোগ থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সদর থানার কোয়ার্টার সংস্কার, ব্যারাক ভবন নির্মাণ, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস সংস্কার, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও বাসভবন মেরামত, সদর হাসপাতালের টয়লেট ও রান্নাঘর সংস্কার, হাসপাতালের কোয়ার্টার মেরামত, জেলা জজ আদালতের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কার, জেলা কারাগারের কাজ, জেলা প্রশাসকের বাসভবন সংস্কার এবং মুজিবনগর প্রশাসনিক ভবনের উন্নয়নকাজ।
এ ছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবনে সংস্কার ও ছোট পার্ক নির্মাণের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশ প্রকল্পেই উন্মুক্ত দরপত্রের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, “গণপূর্ত বিভাগে এখন দরপত্র ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া অন্য কেউ কাজ পান না।”
আরেক ঠিকাদারের অভিযোগ, “যারা বিশেষ সুবিধা দেয়, তারাই কাজ পায়। আমরা নিয়ম মেনে লাইসেন্স নবায়ন করি, কর দিই, ব্যাংক গ্যারান্টি রাখি; কিন্তু কোনো কাজ পাই না।”
এদিকে কয়েকটি প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু কাজ শেষ হওয়ার আগেই দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। সদর হাসপাতালের একটি সংস্কারকাজে ব্যবহৃত টাইলস ও রঙের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক সময় তাদের মতামত ছাড়াই গণপূর্ত বিভাগ কাজ শুরু করে দেয়। এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা অনেক সময় জানিই না কী ধরনের কাজ হচ্ছে বা কত টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, জরুরি কাজের অজুহাতে নিয়ম ভঙ্গ করা হলেও অধিকাংশ প্রকল্পই ছিল পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া টেন্ডার ছাড়া এভাবে কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসান বলেন, “টেন্ডার ছাড়া কাজ হয়েছে—এটা সত্য। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনের কারণেই কাজগুলো করতে হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “টেন্ডার ছাড়া কাজ করার পূর্ণ ক্ষমতা আমার নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।” তবে লিখিত অনুমোদনের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের যশোর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, “টেন্ডার ছাড়াই প্রায় ১৯টি প্রকল্পের কাজ চলছে—এ বিষয়ে আমি অবগত নই। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের কাজ করার সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com