
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) মো. আহম্মদুল্লাহকে চলতি মাসের ১৩ তারিখে হঠাৎ বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকার মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের লিয়াজোঁ অফিসে কর্মরত। তবে এই বদলির পেছনে রয়েছে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে শুধু বদলির আদেশ দিয়েই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাত্র সাত বছরের চাকরি জীবনে মো. আহম্মদুল্লাহ শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। শুধু তিনি নন, তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামেও গড়ে উঠেছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি, রেস্টুরেন্ট, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও স্বর্ণের বিশাল মজুদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিপিসিতে উপ-ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন আহম্মদুল্লাহ। তবে তার নিয়োগ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের আশীর্বাদেই তিনি চাকরি পান। একসময় চেয়ারম্যানের মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন আহম্মদুল্লাহ। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে তিনি বিপিসিতে প্রবেশ করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝালকাঠির বাসিন্দা হয়েও তিনি চাকরিতে যোগ দিতে ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতার প্রত্যয়নপত্রে তাকে সক্রিয় কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সহকারী ব্যবস্থাপক সমমানের চেয়ারম্যানের পিএস পদে উপ-ব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হয়েও দীর্ঘদিন বহাল ছিলেন আহম্মদুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও তিনি সাত বছরের বেশি সময় একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি ২০২১ সালে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলেও মাত্র একদিনের মধ্যে সেই আদেশ বাতিল করে আবার আগের পদে ফিরে আসেন।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের পিএস পদ ব্যবহার করে তিনি বিপিসিতে বদলি, পদোন্নতি, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন। বিভিন্ন কোম্পানি ও ডিপো থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, রেস্ট হাউসে ভুয়া বিল তৈরি, প্রকল্প কমিশন বাণিজ্য এবং জ্বালানি আমদানিতে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২১ সালে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি প্লট হস্তান্তরের নথিও পাওয়া গেছে। বর্তমানে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। স্থানীয়দের দাবি, জমির প্রকৃত মূল্য সরকারি কাগজে দেখানো দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
এছাড়া বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও এসএনডি হিসাব পরিচালনায়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজের পছন্দের ব্যাংকে বিপিসির কোটি কোটি টাকা জমা রেখে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতেও বিপিসির বিপুল অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব হিসাবে জমাকৃত প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা এখনো উত্তোলন করতে পারেনি বিপিসি।
বিপিসির বিভিন্ন প্রকল্প—যেমন এসপিএম প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন এবং ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ, জাহাজ বরাদ্দ, বিটুমিন ও ডিজেল আমদানির অনুমোদনসহ নানা খাতে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি বরিশাল অঞ্চলের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করিয়েছেন। আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের বিপিসির বিভিন্ন অফিস, রেস্ট হাউস ও ডিপোতে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আহম্মদুল্লাহ এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বদলি বা চাকরি হারানোর ভয় ছিল। তার অনুমতি ছাড়া বিপিসিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতো না বলেও দাবি করেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে মো. আহম্মদুল্লাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। দুদক সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com