
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর উন্নয়ন সংস্থা। রাজধানীতে প্লট বরাদ্দ, ভবনের নকশা অনুমোদন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। আর সেই প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এক অফিস সহকারীকে ঘিরে এখন ব্যাপক আলোচনা, বিস্ময় ও নানা অভিযোগ উঠেছে।
রাজউকের জোন-৮–এ কর্মরত অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের বিপরীতে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য। রাজধানীতে বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, উত্তরা ও পূর্বাচলে প্লট, দামী গাড়ি এবং গ্রামের পর গ্রাম জমির মালিকানা নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনোয়ার আলমের মাসিক সরকারি বেতন প্রায় ২০ হাজার টাকার কিছু বেশি। অথচ ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ওয়াসা রোড এলাকায় রয়েছে তার মালিকানাধীন নয়তলা ভবন। এছাড়া শহীদ ফারুক রোড এলাকায় দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে রাখা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাজনাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়দের কাছে আনোয়ার আলম শুধুমাত্র একজন সরকারি কর্মচারী নন; বরং তিনি ‘আলম স্যার’ নামেই পরিচিত। এলাকাবাসীর অনেকে তাকে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বলে মনে করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তার চলাফেরা, গাড়িবহর এবং সামাজিক প্রভাব দেখে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হন।
গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন আনোয়ার আলম। রমজানে ইফতার বিতরণ, শীতবস্ত্র প্রদান, কোরবানির সময় গরু বিতরণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মূলত সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমরা এতদিন ভাবতাম উনি রাজউকের বড় কর্মকর্তা। এখন শুনছি তিনি অফিস সহকারী। তাহলে এত সম্পদ কোথা থেকে এসেছে?”
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মাজনাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় জমি কেনার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন আনোয়ার আলম। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় কেউ জমি বিক্রির কথা বললেই তার লোকজন দ্রুত যোগাযোগ করে এবং বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম প্রস্তাব দিয়ে জমি কিনে নেয়। এতে অন্য ক্রেতারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না।
একজন স্থানীয় কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জমি বিক্রির খবর পেলেই তার লোকজন আগে চলে আসে। নগদ টাকার কারণে অনেকেই রাজি হয়ে যায়।”
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আনোয়ার আলম দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কোন ফাইল কোথায় আটকে আছে, কোন নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে কিংবা কোন প্লটের নথি ঝুলে আছে—এসব তথ্য ব্যবহার করেই তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন।
একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “রাজউকে নিচের স্তরের কিছু কর্মচারীও দীর্ঘদিন একই জায়গায় কাজ করতে করতে বড় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ফাইল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থেকেই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।”
আরেকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, “তার বিরুদ্ধে ফাইল আটকে রাখা, নথি গায়েব এবং প্রভাবশালী মহলের হয়ে কাজ করার অভিযোগ বহুদিনের। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইত না।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আনোয়ার আলমের স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকাও সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত। তিনি অডিট বিভাগের হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এবং অবৈধ আয়ের অর্থ বিভিন্ন সম্পদ ও নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, ঢাকায় নির্মিত ভবন ও ফ্ল্যাটের ভাড়া থেকেও এখন বিপুল আয় হচ্ছে তাদের। তবে প্রশ্ন উঠেছে—একজন অফিস সহকারীর সীমিত বেতনে কীভাবে এত বড় সম্পদের ভিত্তি তৈরি হলো?
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে সেটি তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব থাকলে অনেক সময় এসব অনুসন্ধান এগোয় না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্লট, নকশা অনুমোদন এবং ফাইল ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে নিচের স্তর থেকে শুরু করে কিছু অসাধু কর্মকর্তা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। আনোয়ার আলম সেই ব্যবস্থারই সুবিধাভোগী বলে মনে করছেন অনেকে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে আনোয়ার আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক সাংবাদিক দেখেছি। যা ইচ্ছা লেখেন। আমার কিছু যায় আসে না।” তার এই বক্তব্য নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্নীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মচারী প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রভাবের সুযোগ নিয়ে অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলছেন। রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়।
স্থানীয় সচেতন মহল এখন আনোয়ার আলমের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করছে। তাদের মতে, ঢাকায় থাকা ভবন, ফ্ল্যাট ও প্লটের পাশাপাশি গ্রামের জমি, আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন আইনজীবী বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীর সম্পদের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্য থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত। প্রয়োজনে দুদকের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান শুরু করা দরকার।”
মাজনাবাড়ি এলাকায় এখনও আনোয়ার আলমের প্রভাব স্পষ্ট। তবে সেই প্রভাবের আড়ালে এখন বড় হয়ে উঠছে একটাই প্রশ্ন—একজন সাধারণ অফিস সহকারী কীভাবে গড়ে তুললেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে স্থানীয় মানুষ, সচেতন মহল এবং দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন পর্যবেক্ষক।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com