
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)–এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে আবারও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে বিল অনুমোদন, কাজের তদারকি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানো হতো। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত বা সরকারি তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবে স্থানীয় ঠিকাদার, এলাকাবাসী এবং দপ্তরের একাধিক সূত্র অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এলজিইডির একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দেবীনগর–হাশেম মাদবর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ প্রকল্পে নির্ধারিত কাজ সম্পূর্ণ না হলেও অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে বর্ষাকালে সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া রাধানগর–কৃষ্ণদেবপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের বিল উত্তোলন করা হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছিল সীমিত। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অফিসিয়াল নথিতে কাজের অগ্রগতি দেখানো হলেও বাস্তবে উন্নয়নের চিত্র ছিল ভিন্ন।
বান্দুরা–বারুয়া–শিকারীপাড়া সড়ক প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৯ কোটি টাকার এ প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই অগ্রিম বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। পরে কাজের অগ্রগতি না থাকায় প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করা হয়। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্প এলাকায় বাস্তব কাজের উপস্থিতি খুব কম থাকলেও বরাদ্দের অর্থের একটি অংশ আগেই উত্তোলন করা হয়েছিল।
শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বদলি ও পদায়ন নিয়েও মো. ফিরোজ আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সমন্বিত চক্রের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে বিল ছাড়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়ত।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মো. ফিরোজ আলম তালুকদারের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পুনরায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তার পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এক পর্যায়ে বলেন, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় শুধু একজন কর্মকর্তার নয়; সংশ্লিষ্ট অন্য প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও এতে জড়িত থাকতে পারেন। তার এ বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি দমন ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এলজিইডির মতো বড় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ তদন্ত নয়, পুরো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। তারা প্রকল্প অনুমোদন, বিল ছাড়, কাজের মান যাচাই এবং তদারকির প্রতিটি ধাপে স্বাধীন অডিট ও ডিজিটাল নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং নথিভুক্ত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দ্রুত শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যাবে।
মো. ফিরোজ আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে এখনো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্ত হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ, প্রকল্প বাস্তবায়নের অসঙ্গতি এবং প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করছেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও কারিগরি অডিট প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়ন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের ভাষ্য, উন্নয়নের নামে বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com