
বিদেশি ঋণের অর্থে বাস্তবায়নাধীন টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পে বিলাসী স্থাপনা ও অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের “সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২” এর আওতায় মূল সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণাগার উন্নয়নের নামে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন, মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার ও কনফারেন্স হল, বিলাসবহুল লাউঞ্জ, সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেমস রুমসহ নানা সুবিধা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থাপনা নির্মাণে কাটা হচ্ছে শত শত গাছ এবং ভরাট করা হচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মধ্যেই সরকারি সংস্থার এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিরপুরের পাইকপাড়ায় সওজের গবেষণাগার এলাকায় বিলাসবহুল চারটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এসব ভবন নির্মাণের জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশায় তৈরি পুরোনো স্থাপনা। একই সঙ্গে কাটা হয়েছে এক হাজারের বেশি সেগুন, মেহগনি ও অন্যান্য গাছ।
শুরুতে গবেষণাগার উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)-কে ২৩২ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হলেও পরে তিন দফায় ব্যয় বাড়িয়ে তা ৩৩৫ কোটিতে উন্নীত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে কম দামে কাজ নিলেও পরে বিভিন্ন আইটেম বাদ দিয়ে নতুন ব্যয়বহুল উপকরণ যুক্ত করে ব্যয় প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সওজের দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কম মূল্যের আইটেম বাদ দিয়ে বেশি দামের আইটেম যুক্ত করে অতিরিক্ত লাভের সুযোগ নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তা অনুমোদন করেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে ১৭ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ভেরিয়েশন করা হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে অস্বাভাবিক।
এদিকে সওজের হাতিরঝিল সংলগ্ন নতুন প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যে ৭০০ আসনের মিলনায়তন, সম্মেলনকক্ষ, ক্যাফেটেরিয়া, লাইব্রেরি, ডে-কেয়ার সেন্টার ও গাড়ি পার্কিংসহ আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। এরপরও গবেষণাগারের জন্য নতুন করে বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এ ধরনের বিলাসী স্থাপনা যুক্ত করা হচ্ছে। তার মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্তরে সুবিধাভোগী চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সওজ সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় শুধু ভবন নির্মাণ নয়, জিপ, মাইক্রোবাস, বাস ও মোটরসাইকেলসহ বিপুলসংখ্যক যানবাহনও কেনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় মূল প্রকল্পের বাইরে গোপনে প্যাকেজের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ওয়ালিউর রহমান দাবি করেন, ২০১৪ সালের নকশার পর নতুন চাহিদা যুক্ত হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে। তার ভাষ্য, ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় বিশ্বমানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংযোজন করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় ভেরিয়েশন এবং বিলাসী ব্যয় সরকারি ক্রয়নীতির পরিপন্থী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভেরিয়েশন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ঋণের টাকায় বিলাসী প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চাপ তৈরি করবে।
এদিকে প্রকল্প এলাকায় রাজউকের অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগও উঠেছে। পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকায় সবুজ এলাকা ও জলাভূমি দ্রুত কমে যাওয়ার মধ্যে সরকারি প্রকল্পে গাছ কাটা ও পুকুর ভরাট অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যয় ও বিলাসী খাতগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সুযোগ থাকলে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য নেওয়া সাসেক-২ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। পরে তিন দফায় ব্যয় বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com