
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিট দুর্নীতির ঘটনায় একসময় বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ও পরে বরখাস্ত হওয়া আশরাফুল আলম বর্তমানে সংস্থাটির পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) পদে বহাল রয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও পুনর্বহাল ও পরবর্তীতে পদোন্নতি পাওয়ায় বিমানের অভ্যন্তরে ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৯ সালে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে টিকিট দুর্নীতির অভিযোগে আশরাফুল আলমকে ওএসডি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেই একই বিভাগের পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ দুই দশকে নানা অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৮ সালে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দেন আশরাফুল আলম। শুরু থেকেই তিনি বিপণন ও বিক্রয় বিভাগে কাজ করেন। টিকিট বিক্রি, এজেন্ট সমন্বয় ও আঞ্চলিক বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছান তিনি।
২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন বিপণন প্রকল্প ও আঞ্চলিক বিক্রয় কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পর ২০০৭ সাল থেকে বিদেশি স্টেশন ব্যবস্থাপনায় কাজ শুরু করেন। কুয়েত স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে টিকিট বিক্রি, ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে সমন্বয় এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব ব্যবস্থাপনায় অসংগতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্ক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আশরাফুল আলম। ওই সময় টিকিট ইস্যু, এজেন্সি সমন্বয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে কিছু ফ্রি টিকিট ইস্যু এবং নির্দিষ্ট এজেন্সিভিত্তিক বুকিং নিয়ে অভ্যন্তরীণ অডিটে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়।
২০১৭ সালে দেশে ফিরে বিপণন ও বিক্রয় ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় বিমানের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়ে এবং ম্যানুয়াল টিকিট বিক্রির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও কুয়ালালামপুর রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে আসন ব্লক করে রাখার অভিযোগ ওঠে।
সেসময় জেনারেল ম্যানেজার (ঢাকা) পদে থাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন আশরাফুল আলম। ২০১৯ সালের তদন্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিমান বোর্ড তাকে টিকিট দুর্নীতির ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ম্যানুয়াল বিক্রয় ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টিকিট নিয়ন্ত্রণ করা হতো। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি করা হয় এবং আসন খালি থাকা সত্ত্বেও কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়, যার ফলে বিমানের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়া তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সহায়তায় পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন), মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) এবং মহাব্যবস্থাপক (জেলা বিক্রয়)—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একসঙ্গে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে এর আগেই ২০১৯ সালের এপ্রিলে তাকে ওএসডি করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সে সময় মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সামনে টিকিট দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকারও করেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে ২০২১ সালের শুরুতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আবু সালেহ মোস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার পর কেবল ‘ভর্ৎসনা’ করে তাকে পুনর্বহাল করা হয়। শুধু তাই নয়, পুনরায় তাকে টিকিটিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও যুক্ত করা হয়।
গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার পুনর্বহাল ও পদোন্নতি নিয়ে বিমানের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে টিকিট বিক্রি ও বিপণন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী বলয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। ফলে সেই বলয়ের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে।
পুনর্বহালের পর আশরাফুল আলম আবারও বিপণন ও বিক্রয় ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় কাঠামোতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ সময় নতুন করে গ্রুপ বুকিং ও আসন ব্লক করে রাখার অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা রুটে ইকোনমি ক্লাসের টিকিটের দাম ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, একই সময়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টি টিকিট গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে আটকে রেখে পরে উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি করা হয়। এতে সাধারণ যাত্রী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিক ও প্রবাসীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে টিকিট ইস্যু ও রি-ইস্যু ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ রুটে প্রবাসী যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি উঠে আসে।
২০২৩ সালের পর হজ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বাজারের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিমানের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগে আশরাফুল আলমকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এমপি-মন্ত্রীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সরকারের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার অনিয়ম নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পেতেন না বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম চালিয়ে গেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মাথায়, ১৪ আগস্ট বিমানে প্রশাসনিক রদবদলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে জেনারেল ম্যানেজার (ঢাকা) পদে থাকা আশরাফুল আলমকে মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যে পদে বরখাস্ত হওয়ার আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত ছিলেন, এবার সেই পদেই পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান।
টিকিট দুর্নীতির ঘটনায় বরখাস্তের বিষয়ে আশরাফুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, “এগুলো অনেক দিন আগেই সমাধান হয়ে গেছে।” কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো ভুল তথ্য।”
এ বিষয়ে জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রশীদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে জানা যায়, ওই দিনই মিজানুর রশীদকে ‘নির্বাহী পরিচালক’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় সেই পদোন্নতি বাতিল করা হয়।
সূত্র জানায়, সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কেনাকাটায় প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়েছিলেন মোহাম্মদ মিজানুর রশীদ। যদিও তিনি সেই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com