
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গঠন, টেন্ডার বাণিজ্য, বিধিবহির্ভূতভাবে দরপত্র অনুমোদন এবং কোটি কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, খান ট্রেডার্স, খান বিল্ডার্স, রাতুল এন্টারপ্রাইজ ও ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ভোলা গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেন মানিক লাল দাস। তার প্রভাবে বরিশাল গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান এবং পরে বিভিন্ন নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে অনিয়ম ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হতো।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্রের দাবি, খান বিল্ডার্স, রাতুল এন্টারপ্রাইজ, ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার ও খান ট্রেডার্স নামে চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এসব প্রতিষ্ঠানের নামে নির্দিষ্টসংখ্যক কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতো।
অভিযোগ উঠেছে, ঝালকাঠি, ভোলা, বরিশাল ও কাশীপুর এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়।
২০২২ সালে যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে সীমিত দরপত্রের কাজ উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের একাধিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এসব প্রকল্পের মধ্যে কুমারখালী কৃষি আবহাওয়া অফিস, কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, কুষ্টিয়া ম্যাটসের বিভিন্ন ভবন ও হোস্টেল মেরামত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তির অনেক তথ্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বা প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও মানিক লাল দাস নিজেই বিভিন্ন প্রকল্পে সময় বৃদ্ধি, ভেরিয়েশন ও প্রাক্কলন অনুমোদন দেন।
ঝিনাইদহ পাসপোর্ট অফিস, কুষ্টিয়া কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর, মাগুরা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন এবং শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প চলাকালেও মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি দীর্ঘসময় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নিয়মিত সাইট পরিদর্শনে যেতেন না।
২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি হাসপাতাল ভবনের গাড়ি বারান্দার ছাদ ধসের ঘটনায় প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই ঘটনায় কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মানিক লাল দাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সুশাসনকর্মীদের মতে, গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের দাবি, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com