
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নোয়াখালী সদর উপজেলায় চলমান খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকদের পরিবর্তে ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন ব্যবহার করে অপরিকল্পিতভাবে খাল খননের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে কৃষি সেচ উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকারের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়া, কালাদরাপ, দাদপুর ও নোয়ান্নই ইউনিয়নের পাঁচটি খালের প্রায় ২৮ কিলোমিটার এলাকা পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ওয়েজ কস্ট ও নন-ওয়েজ কস্ট মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাতটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। গত ৩ মে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকল্পে স্থানীয় নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে ৪৩ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করার কথা, সেখানে অধিকাংশ স্থানে শ্রমিকের উপস্থিতি নেই। পরিবর্তে কয়েকটি পয়েন্টে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার কাজ চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খাল খননের আগে যথাযথ লিখিত নোটিশ ছাড়াই মাইকিং করে খালের দুই পাশের গাছপালা ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেকে দাবি করেন, নির্দেশ না মানলে সরকারি উদ্যোগে স্থাপনা অপসারণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজেদের ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ফেলছেন এবং বসতঘর, বাউন্ডারি ওয়াল ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে নিচ্ছেন।
এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার কারণে খালের পাশের সড়ক ও বাড়িঘর ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও খালের স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমিয়ে ফেলা হচ্ছে এবং খনন করা কাদামাটি মানুষের ফসলি জমি ও বসতভিটায় ফেলে রাখা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের কথা বলে দরিদ্র মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দাবি করেন, ওয়েজ কস্টের টাকা শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর নিয়ম থাকলেও ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে বিভিন্ন নামে ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, প্রকল্পের প্রকৃত কাজের তুলনায় বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাস্টার রোল জালিয়াতির মাধ্যমেও অর্থ লোপাটের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম মিয়াজী নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সাংবাদিকরা প্রকল্পে শ্রমিক না থাকা এবং ভেকু ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেও প্রকল্প এলাকায় শ্রমিক খুঁজে না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের তালিকা, ব্যাংক হিসাব, মাস্টার রোল ও নন-ওয়েজ কস্ট সংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরুর আগেই সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, “কাজ শুরুর পর কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য পিআইওসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক নিয়োগ বা প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com