
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বর্তমান চেয়ারম্যান সংস্থাটিকে দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, অবৈধভাবে স্লিপার বাসের নিবন্ধন প্রদান এবং অনিয়মের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এস এম মাহফুজুর রহমানকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিআরটিএর ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের অভিযোগে অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি বিভিন্ন দুর্ঘটনায় স্লিপার বাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক স্লিপার বাস যথাযথ কারিগরি অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই ছাড়াই সড়কে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। এসব বাসে জরুরি নির্গমন পথ, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ আসন বিন্যাসের ঘাটতি থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
গত ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকায় কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে একটি স্লিপার বাসের ধাক্কায় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যশোর সার্কেলে কর্মরত অবস্থায় এস এম মাহফুজুর রহমান শারীরিক পরিদর্শন ছাড়াই ১২টি স্লিপার বাসের নিবন্ধন অনুমোদন দেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব বাসের নকশা ও নিরাপত্তা কাঠামোতে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে নিবন্ধন দেওয়া হয়।
যশোর-ব-১১-০২৫০ থেকে ০২৬১ সিরিজের এসব বাসের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ওই নিবন্ধিত বাসগুলোর একটি ‘রিলাক্স পরিবহন’ ২০২৪ সালের ১৭ মে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুর্ঘটনায় পড়ে পাঁচজন নিহত হন। তদন্তে বাসটির আসন বিন্যাস ও কাঠামোগত ত্রুটির বিষয় সামনে আসে বলে জানা গেছে।
পরে ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট একই বাস কুমিল্লার মিয়াবাজার এলাকায় এক নারীকে চাপা দিলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হলেও নিবন্ধন অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি একই ধরনের অভিযোগে বিআরটিএর দুই কর্মকর্তা—সহকারী পরিচালক এস এম ওয়াজেদ হোসেন এবং মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
কিন্তু একই অভিযোগে অভিযুক্ত এস এম মাহফুজুর রহমান এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম ধীরগতির শিকার হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. তৌহিদুল ইসলাম তুষার একাধিক প্রতিবেদন জমা দিলেও পরবর্তীতে সেই ফাইলের অগ্রগতি থেমে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, কিছু প্রভাবশালী মহল তদন্ত প্রতিবেদন আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ স্লিপার বাসের নিবন্ধন পুনঃমূল্যায়ন এবং অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com