
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের সাবেক কমিশনার মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, শুল্ক ফাঁকি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া একটি হত্যা চেষ্টা মামলায়ও তার নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে তিনি ‘নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর, ঢাকা’-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বিতর্ক ও তদন্ত চলমান থাকলেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ‘ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান জাকির হোসেন। এই প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তিনি সংশ্লিষ্ট মহলে ‘ভ্যাট জাকির’ নামে পরিচিতি পান।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের আওতায় নিজের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তার স্ত্রীর সম্পৃক্ততা থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকেও প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া তার স্ত্রীর নামে একাধিক বন্ড লাইসেন্স ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্যও উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদেশ সফরের নামে সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে অবৈধ উপার্জনের অর্থ বৈধ দেখাতে বই বিক্রির রয়্যালটি দেখানোর কৌশল গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার থাকাকালে বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের শুল্ক ফাঁকিতে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে।
একটি ঘটনায় অভিযোগ করা হয়, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের ই-সিগারেট সরঞ্জাম ও সানগ্লাসের প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দামে ঘোষণা দেওয়া হলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া আরও কয়েকটি আমদানি চালানে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হতো।
বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছে। দুদকের সহকারী পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বিষয়টি তদন্ত করছেন বলে জানা গেছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা কাস্টমসের সাবেক কমিশনার মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে জাকির হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অর্থনীতি ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, কাস্টমস ও ভ্যাট খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দুর্নীতির অভিযোগ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। তারা মনে করছেন, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞরা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com