টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য ও সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের দাবি; তদন্ত দাবি ঠিকাদারদের
সরকারি চাকরির নির্ধারিত বেতন কাঠামোর আড়ালে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। খুলনা, কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য এবং ঠিকাদার সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যক্তিগত লাভের উৎসে পরিণত করেছিলেন জাহিদুল ইসলাম। যেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি বেতন-ভাতার সঙ্গে তার বর্তমান জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। খুলনা মহানগরীর অভিজাত এলাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের পাশাপাশি বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে মোটা অঙ্কের এফডিআর এবং আত্মীয়-স্বজনের নামেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাদের অযোগ্য ঘোষণা করে সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষ করে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার (ওটি), আইসিইউ, সিসিইউ এবং লিফট স্থাপনের মতো সংবেদনশীল কাজগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে উচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়া হয়।
এছাড়া ফাইল নিষ্পত্তিতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে ঠিকাদারদের চাপের মুখে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আনুষঙ্গিক প্রকল্পেও অনিয়ম
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের সংযোগ সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পুকুর খননের মতো আনুষঙ্গিক কাজেও অতিরিক্ত প্রাক্কলন দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কুষ্টিয়ার মডেল মসজিদ ও নতুন সার্কিট হাউস নির্মাণ প্রকল্পেও। অভিযোগ অনুযায়ী, বিতর্কিত ও কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রকৃত যোগ্য ঠিকাদারদের বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়।
সংস্কার কাজেও অনিয়মের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সরকারি ভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামেও নানা অনিয়ম করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার একটি পুরোনো সরকারি বাসভবনের কাঠামো পরিবর্তনের নামে ভুয়া দরপত্র আহ্বান এবং একই অর্থবছরে একই কাজের জন্য একাধিক বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণেও একই অর্থবছরে একাধিক টেন্ডার ডেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, জেলা সদর হাসপাতাল, জজ কোর্ট ও ডিসি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোতেও চলমান কাজের ওপর নতুন করে কাল্পনিক প্রকল্প দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই
ক্ষুব্ধ ঠিকাদার ও সচেতন নাগরিকরা একাধিকবার মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলামের সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় ঠিকাদার ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও বড় অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।