
ঢাকার আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনের একটি কক্ষে সকাল থেকেই অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা একে একে ঢুকছেন, মুখে চাপা ক্ষোভ আর প্রত্যাশার মিশ্র ছাপ। টেবিলের অপর প্রান্তে বসে আছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। সামনে আসন্ন বাজেট—কথা হবে কর, ব্যবসা, আর বাস্তবতার।
আলোচনা শুরু হতেই ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে উঠে আসে পুরোনো কিন্তু জ্বলন্ত অভিযোগ—ঘুষ, দুর্নীতি আর হয়রানি। বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম শাহাদাৎ হোসেন সরাসরি বললেন,
“কর কমানোর কথা আমরা বলি বাধ্য হয়ে। কিন্তু যদি কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়, তাহলে আর কখনো কর কমানোর দাবি করব না। আপনারা শুধু আমাদের স্বস্তিতে কাজ করতে দিন।”
কথাগুলো ঘরের ভেতর এক ধরনের নীরবতা তৈরি করে। যেন সবাই জানে—এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়, কিন্তু সমাধান এখনও দূরে।
এরপর কথা বলেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তাঁর কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট।
“চট্টগ্রাম বন্দরে শুধু দেরির কারণে আমাদের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। পণ্য পরীক্ষা করতে সময় লাগে, অনুমতি পেতে সময় লাগে—কিন্তু ক্ষতি তো আমাদেরই।”
একটু থেমে তিনি যোগ করেন, “আমাদের অঙ্গীকার নিয়ে পণ্য ছেড়ে দিন, আমরা তো পালিয়ে যাব না।”
আলোচনা ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়। কেউ বলছেন ভ্যাট কমাতে হবে, কেউ বলছেন সাব-কন্ট্রাক্টের ওপর কর তুলে দিতে হবে। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সতর্ক করে দেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করে দেয়।
“বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে,”—বললেন তিনি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সুতার ওপর ভ্যাট কমানোর দাবি তোলেন। তাঁর যুক্তি, উৎপাদন খরচ না কমলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। অন্যদিকে বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন থেকে এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, স্যাম্পল আনতেই যদি শুল্ক দিতে হয়, তাহলে ব্যবসার গতি কমে যায়।
প্রযুক্তি খাতও পিছিয়ে নেই। বেসিসের প্রতিনিধি মুশফিকুর রহমান করহার কমানোর দাবি জানিয়ে বলেন, “৪৩ শতাংশ কর দিয়ে উদ্ভাবন টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
সব অভিযোগ, দাবি আর যুক্তি শুনে অবশেষে মুখ খোলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তাঁর কণ্ঠে বাস্তবতার চাপ স্পষ্ট।
“সবাই যদি কর কমাতে বলে, তাহলে রাজস্ব আয় বাড়বে কীভাবে?”—প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
তবে তিনি আশ্বাসও দেন। কিছু সমস্যার সমাধান হবে, কিছু বিষয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সোলার খাতে জটিলতা দূর করার কথাও বলেন তিনি।
দিনের আলো ফুরিয়ে এলে বৈঠক শেষ হয়, কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যায়। ব্যবসায়ীরা কি স্বস্তি পাবে? দুর্নীতি কি সত্যিই কমবে? আর রাষ্ট্র কি রাজস্ব বাড়াতে পারবে?
কক্ষের বাইরে বেরিয়ে আসা এক ব্যবসায়ী ধীরে বলে ওঠেন,
“আমরা কর দিতে রাজি আছি… শুধু একটু ন্যায্যতা চাই।”
সেই কথাটাই যেন পুরো বৈঠকের সারমর্ম হয়ে থাকে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com