
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল ও নারীদের হয়রানির মতো অপরাধের ঘটনায় এখন প্রায়ই উঠে আসছে ‘কিশোর গ্যাং’-এর নাম। এক সময় এসব অপরাধে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সম্পৃক্ততা দেখা গেলেও বর্তমানে সেই জায়গা দখল করেছে কথিত কিশোর গ্যাং। তবে বাস্তবে এসব গ্যাংয়ের অনেক সদস্যই ১৮ বছরের বেশি বয়সী।
২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান কবীর হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি প্রথম বড়ভাবে আলোচনায় আসে। নিজ বাসার পাশেই, স্কুলের সামনে প্রকাশ্যে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার তদন্তে উত্তরার ‘ডিসকো গ্রুপ’ ও ‘নাইনস্টার গ্রুপ’-এর মতো কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব সামনে আসে। এরপর রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন গ্যাংয়ের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়।
জানা যায়, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এসব গ্রুপ শুরুতে আড্ডা, ঘোরাঘুরি ও বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে একপর্যায়ে তারা মাদক, খুনসহ গুরুতর অপরাধেও সম্পৃক্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। মোবাইল ফোন ছিনতাইকে কেন্দ্র করে ‘এলেক্স গ্রুপ’ ও ‘আরমান-শাহরুখ গ্রুপ’-এর মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত ইমনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল।
অন্যদিকে, শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হয়ে মারা যায় ১৪ বছর বয়সী সজীব মিয়া। মোবাইল ফোন হারানো নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থেকে তার মৃত্যু হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি দলে ৭ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে, যাদের বয়স সাধারণত ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এসব গ্যাং চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, দখলবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে তারা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্য দেখাতে গিয়ে এসব কিশোর-তরুণ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি—৩২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে পল্লবী থানায় রয়েছে ১৪টি। তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি, মোহাম্মদপুর থানায় একাই ১৬টি গ্যাং সক্রিয়। এছাড়া রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, গুলশান ও উত্তরা বিভাগেও একাধিক গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
চাঁদাবাজির প্রতিবাদে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আদাবর এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা থানা ঘেরাও করেন। বসিলা ও আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে তারা সড়ক অবরোধও করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর বয়সের আবেগ, মাদকাসক্তি এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব—এই তিনটি কারণ গ্যাং সংস্কৃতি বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়ে এসব গ্যাংকে ব্যবহার করছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত এক বছরে হাজারো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ইমাম, শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।
র্যাব জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলোর তালিকা প্রণয়ন ও তাদের শনাক্তে কাজ করছে তারা। পাশাপাশি এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com