
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর গত প্রায় দশ বছরের বিভিন্ন প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাব খাটিয়ে সিনিয়র প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলামসহ পাঁচজন কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ বণ্টন ও নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মনিরুল ইসলামকে সিনিয়র প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তিনি সেই পদে বহাল রয়েছেন।
এ বিষয়ে গত ১৬ এপ্রিল দুদকের উপসহকারী পরিচালক তাছলীমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিটিভি কর্তৃপক্ষকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পসংক্রান্ত কাগজপত্র, ব্যয়ের হিসাব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যেসব কর্মকর্তার তথ্য চাওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. মনিরুল ইসলাম, মো. মান্নাফ হোসেন, মো. সাইফুর রহমান, মো. আরিফুল হাসান এবং আবদুল্লাহ আল হাদী। তাদের গত সাত বছরের বিদেশ সফরের বিবরণ, সফরের উদ্দেশ্য এবং অনুমোদনের তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় ১৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বেলজিয়ামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্টুডিওওয়াচকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার সঙ্গে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও তার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া বিটিভির এনালগ থেকে ডিজিটাল সম্প্রচারে রূপান্তরের জন্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় মনিরুল ইসলামের সুপারিশে। তবে সে সময় দেশের অধিকাংশ দর্শক এনালগ টিভি ব্যবহার করায় প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার আড়ালে এই প্রকল্পে বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিটিভির ১৪টি উপকেন্দ্রে সাব-স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী দুটি সচল সাব-স্টেশন থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো অবকাঠামোর সঙ্গে নতুন যন্ত্রাংশ যুক্ত করে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।
দুদক আরও জানতে পেরেছে, বিটিভির অধিকাংশ টেন্ডার কার্যত মনিরুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়ম ভেঙে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া, কম দরদাতাদের বাদ দেওয়া এবং কমিশনভিত্তিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রধান প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকায় প্রেষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। এ সুযোগে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত ঠিকাদারকে কাজ না দিলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো বলেও জানা গেছে।
বিটিভির আধুনিকায়ন ও অটোমেশন প্রকল্পের প্রথম ধাপে অনুমোদিত ১১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মানসম্মত যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে দ্রুতই প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনাকে ব্যবহার করে পূর্বের অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে কিনা, সেটিও তদন্ত করছে দুদক।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ক্রয়সংক্রান্ত বিল-ভাউচার, স্টক ও বিতরণ রেজিস্টারসহ বিভিন্ন নথিও চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নথিপত্র পর্যালোচনার পর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com