
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক অবকাঠামো খাতের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক বিশাল সিন্ডিকেট উন্মোচিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারের প্রভাবশালী গোপন নথিপত্র এবং নর্থইস্ট নিউজের অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এখন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জাহাজ ক্রয়ে শত শত কোটি টাকার কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুদক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছিল, ঠিক সেই ১৮ মাস সময়ের মধ্যেই এই বিশাল দুর্নীতির জাল বিস্তৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুদকের ২০২৫ সালের ৭ জুলাই এবং ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারির দুটি পৃথক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে “মানি লন্ডারিং এবং সম্পদ গোপনের” অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের বড় বড় প্রকল্পগুলোতে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান তাঁর মেয়াদে চীন থেকে ছয়টি ক্রেন ক্রয়ের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেন। সরকারি নথিতে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি ক্রেন কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে একই মূল্যে মাত্র তিনটি ক্রেন কেনা হয়েছে। ফলে একটি একক প্রকল্প থেকেই প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
এই আর্থিক অনিয়মের ভাগ বাটোয়ারার সাথে নৌবাহিনীর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে পড়েছে।
মনিরুজ্জামান যখন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন, তখন চীন থেকে জাহাজ কেনায় বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ে। ২৪৮৬ কোটি টাকায় ছয়টি জাহাজ কেনার কথা থাকলেও কৌশলে একই টাকায় মাত্র চারটি জাহাজ কেনা হয়।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাকি ৪৮৬ কোটি টাকা বিভিন্ন প্রভাবশালীদের পকেটে গিয়েছে, যা পরবর্তীকালে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
দুদকের নথিতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাভিত্তিক ‘মুকুল কর্পোরেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি মোহাম্মদ কাজী মুকুল নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও দুদক একে একটি ‘ফ্রন্ট কোম্পানি’ হিসেবে দেখছে।
অভিযোগ রয়েছে, নৌবাহিনী ও বন্দরের দুর্নীতির অর্থ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়েছে।
অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা আরও ভারী হয়েছে তাঁর স্ত্রীর দুলাভাই মো. জিল্লুর রহমানের মাধ্যমে।
জিল্লুর রহমান, যিনি মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং অলিলা গ্রুপের এমডি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশ ত্যাগ করেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিল্লুর রহমান কাতারে একটি বিশাল মার্কেট কিনেছেন।
গণমাধ্যমের দাবি এবং দুদকের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই মার্কেটের পুরো অর্থ জিল্লুর রহমানের নয়,
বরং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানের দুর্নীতির অর্থ দিয়ে এটি কেনা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি ড্রেজিং প্রকল্পে প্রায় ১৫৩৮.১৯ কোটি টাকার অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
প্রকল্পের অনুমোদন থেকে শুরু করে ঠিকাদার নির্বাচন—প্রতিটি ধাপে একটি “প্রভাবশালী চক্র” সক্রিয় ছিল।
দুদকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই চক্রটি দীর্ঘকাল ধরে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রের অর্থ লুট করে আসছে।
তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশ অফশোর ফিন্যান্সিয়াল সেন্টারের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের ঘোষিত আয়ের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, নৌবাহিনী ও বন্দরের এই অনিয়মের মূলে পৌঁছাতে একটি “বৃহত্তর ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত” প্রয়োজন। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তদন্ত আরও গভীরে নিয়ে গেলে আরও অনেক প্রভাবশালী সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তার নাম বেরিয়ে আসতে পারে।
দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন দুর্নীতির খবর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত।
দুদকের এই সাহসী পদক্ষেপ যদি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে বাংলাদেশে ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে।
@muktibarta71
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com