খুলনা শহরে সোনাডাঙ্গা এলাকায় বয়রা ক্রস রোডে ৬ তলা বিলাসবহুল বাড়ি, নিরালা আবাসিক এলাকায় অভিজাত নিরালা প্যালেসে দুটি ফ্ল্যাট, তেঁতুলতলা মৌজায় ১১ বিঘা জমি, ঢাকা ও কুয়াকাটায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটসহ ব্যাংকে গচ্ছিত মোটা অঙ্কের অর্থসহ অঢেল সম্পদ।
এত সম্পদের ফিরিস্তি যাকে ঘিরে তার নাম মো. গাউস। অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব তিনি। শুধু সম্পদের পাহাড় গড়েননি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বানিয়ে অবৈধভাবে চাকরির মেয়াদও বাড়িয়েছেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর খুলনায় নিরিবিলি জীবনযাপন করলেও প্রশাসন ক্যাডারের আওয়ামীপন্থিদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা যায় খুলনার তেরখাদা উপজেলা বারাসাত ইউনিয়নের কাওসার মোল্লার ছেলে মো. গাউস মোল্লা ১৯৮৫ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই চাকরি জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে মালিক হয়েছেন শত কোটি টাকার। আওয়ামীপন্থি অফিসার হিসেবে এইচটি ইমাম ও ড. মশিউর রহমান সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা থাকায় অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়ানোর পরও বারবার পেয়েছেন দায়মুক্তি ও পদোন্নতি। কোনো জেলায় ডিসি না থাকার পরও হয়েছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সবিচও।
১৯৮৫ সালে পাটগ্রাম উপজেলায় সহকারী কমিশনার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন মো. গাউস। এরপর হাতিয়াবান্দা উপজেলায় ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন গাউস। ত্রাণ নিয়ে কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এই আমলার বিরুদ্ধে। ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ায় তাকে বদলি করা হয় সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের সচিব হিসেবে। সেখানে টাকা নিয়ে অবৈধ উপায় দোকান বরাদ্দ দেওয়ায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আবারও বদলি হয় নিলফামারীতে। সেখানে পাটগ্রাম, হাতিয়াবান্দা ও নিলফামারী তামাক চাষীদের সঙ্গে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ব্যাপক সম্পদ। সেখান থেকেও যশোরের অভয়নগর ও কেশবপুরে ইউএনও থাকা অবস্থায় সখ্যতা তৈরি হয় সাবেক মন্ত্রী ইসমত আরা সাদেকের সঙ্গে। এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পরে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর সাতক্ষীরার এডিসি জেনারেল সেখান থেকে সরাসরি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ও পরে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত লম্বা সময় থাকেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে বরিশালে প্রশাসন ক্যাডারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে বরিশালে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন ঝাড়ু মিছিল হলে তাকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চাকরি শেষের মাত্র একমাস আগে তাকে ওএসডি করতে বাধ্য হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা সনদে বাড়িয়েছেন চাকরির মেয়াদ
মো. গাউস এলাকায় গাউস মোল্লা নামে পরিচিত। নিজের বাড়িগুলোর সামনে সাইনবোর্ডে বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. গাউস লেখা আছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চাকরির মেয়াদও বাড়িয়েছেন তিনি। তবে তার এলাকায় একাধিক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায় তিনি কোথায় কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে আমরা জানি না। এই এলাকার বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চেনে না। সম্মুখসারির মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তেরখাদায় বিশেষ পরিচিত আব্দুল জলিল শেখ।
তিনি বলেন, গাউস মোল্লা মুক্তিযুদ্ধ করেছে এমন কথা শুনিনি। হঠাৎ আশির দশকে তিনি দাবি করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এই এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা সাবেক কমান্ডার চৌধুরী আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিয়ে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ করেন তিনি। বলেন খুলনা প্রেস ক্লাবে এ পর্যন্ত কয়েকবার তার বিরুদ্ধে উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা এক হয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কর্মকর্তা হওয়ায় গাউসই খায়েরকে সবসময় আশ্রয় দিত। উপজেলার ৯১ জন মুক্তিযোদ্ধা থাকলেও গাউসের সহযোগিতায় খায়ের তা নিয়ে ৬ জন বানিয়েছে। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় একাধিকবার তদন্ত করে শতশত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেয়।
সম্পদের পাহাড়
অতিরিক্ত সচিব গাউস চাকরি জীবনে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে মালিক হয়েছেন শত কোটি টাকার। খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় বয়রা ক্রস রোডে ৭ তলা বিশিষ্ট নিজের বাড়ি ৯৬/০১ নুরজাহান ভিলা। বর্তমানে এখানেই বসবাস করেন তিনি। নিরালা আবাসিক এলাকায় ১২ তলা বিশিষ্ট অভিজাত নিরালা প্যালেস ভবনে দুটি ফ্ল্যাট, বটিয়াঘাটার তেতুলতলা মৌজায় ১১ বিঘা জমি, সম্প্রতি যশোরের জমি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। তার দুই ডাক্তার ভাতিজাকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঢাকায় একাধিক সরকারি প্লটের মালিক হয়েছেন তিনি। অবসরের পর যা নিজের অংশ বুঝে নিয়েছেন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার থাকাকালীন তৎকালীন পটুয়াখালির ডিসি অমিতের সহযোগিতায় কুয়াটায় দুটি সরকারি প্লট বাগিয়ে নেন তিনি। এছাড়া নড়াইলের কালিয়ায় ডবপুর মৌজায় জমি, তেরখাদায় স্ত্রী ও সন্তানের নামে কয়েক বিঘা জমি নেকেন তিনি। এছাড়া ব্যাংকের টাকাসহ শতকোটি টাকার মালিক আওয়ামীপন্থি এই আমলা।
এ বিষয়ে মো. গাউস বলেন, আমি অতিরিক্ত সচিব ছিলাম। যা সম্পদ গড়েছি রিটায়ারমেন্টের পরে অবসরকালীন অর্থ দিয়ে করেছি। অর্ধেক ট্যাক্স ফাইলে দেখানো আছে, বাকি অর্ধেকও এবার ট্যাক্স দেওয়ার সময় দেখাব। কোনো অবৈধ সম্পদ নেই আমার। যা আছে তা সবই দৃশ্যমান।মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ভারত থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা, আমি এক জায়গা যুদ্ধ করেছি আর জলিল ভাই আরেক জায়গায় যুদ্ধ করেছে আমার সঙ্গে তার দেখা হয়নি। আর একজন গাউস আছে তেরখাদায়, তার সার্টিফিকেট নিয়ে বিতর্ক আছে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com