সাধারণ যাত্রীদের অধিকার আদায়ের উচ্চকণ্ঠ প্রচারণার আড়ালে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। গত এক দশকে সাধারণ এক অনলাইন সংবাদকর্মীর পরিচয় থেকে তিনি এখন কয়েক শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক ভোল পাল্টে তিনি গড়েছেন এই সম্পদের পাহাড়।
মাটির ঘর থেকে কোটি টাকার জমি
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের ইমামুল্লাহ চরের পূর্ব পাড়ায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এক সময় মাটির দেয়াল আর টিনের ছাউনির জরাজীর্ণ ঘরে অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। এমনকি ২০০৯ সালের দিকে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে স্থানীয় এক নেতার হাতে তাকে আটকে থাকার মতো লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়েছে।
অথচ সেই মোজাম্মেল হক চৌধুরী এখন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর মৌজায় প্রায় ৩ ৪৫ শতক (৮ কানির বেশি) জমির মালিক। ২০১৯ সালে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে চারটি দলিলে তিনি এই বিশাল ভূসম্পত্তি ক্রয় করেন। দলিলে এই জমির মূল্য ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা দেখানো হলেও স্থানীয় বাজারমূল্য অনুযায়ী এর দাম ৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
লাইসেন্সবিহীন পরিবহনের ‘আশ্রয়দাতা’
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশন বা নম্বর প্লেটবিহীন প্রায় দুই শতাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে মোজাম্মেলের ইশারায়। ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন সাংবাদিক সমিতি’র ব্যানার লাগিয়ে এই গাড়িগুলো চালানো হয়, যেখানে মোজাম্মেল হকের নাম ও ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি থেকে বাঁচতে প্রতিটি গাড়ি থেকে তিনি মাসিক নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা বা চাঁদা আদায় করেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক ভোল পরিবর্তন ও ক্ষমতার দাপট
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোজাম্মেল হক চৌধুরী নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে জাহির করতেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছবি সম্বলিত পোস্টার টাঙিয়ে তিনি নিজেকে তাদের আস্থাভাজন হিসেবে প্রচার করতেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রো আরটিসি’র সদস্য পদও বাগিয়ে নেন।
তবে ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে তিনি দ্রুত নিজের সুর পাল্টে ফেলেন। এখন তিনি নিজেকে ‘বিগত সরকারের রোষানলের শিকার’ দাবি করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন এবং বিভিন্ন দপ্তরে তদবির বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছেন।
গ্রেপ্তার ও আইনি জটিলতা
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মিরপুর থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখন তার স্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে, মোজাম্মেল একটি অনলাইন পোর্টালে সামান্য বেতনে কাজ করে সংসার চালান। অথচ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে তার অঢেল সম্পদের চিত্র।
বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকনের করা একটি জিডি এবং সিএমএ আদালতে দায়েরকৃত মামলার (মামলা নং ৫৫১) প্রেক্ষিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে।
বিআরটিএ’র দালালি ও বিলাসিতা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিবের পরিচয়ে বিআরটিএ-তে দালালি ও বদলি বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাধারণ জীবনযাপনের বেশ ধরলেও তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। যার মধ্যে একটি নোহা মাইক্রোবাস এবং দুটি দামী প্রাইভেট কার রয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
যাত্রী অধিকার আদায়ের ‘মুখোশ’ পরে নিজের কল্যাণ নিশ্চিত করা এই ব্যক্তির অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
@durnitirdiary
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com