এসিএম নিউজ, ঢাকা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে থাকতে দেওয়া হতো বাথরুমে। দেওয়া হতো না খাবার। টয়লেটের পানি খেতে হতো তাকে। বাথরুমের পানির সংস্পর্শে থাকায় তার পায়ের নখগুলোতে পচন ধরে।
আজ মঙ্গলবার মোহনাকে নির্যাতনের মামলায় আসামিদের রিমান্ড শুনানির সময় এই নির্মম চিত্র তুলে ধরেন আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন নির্মম চিত্র তুলে ধরার আগে বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। চাঞ্চল্যকর। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা জাতির জানা প্রয়োজন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৪ জনকে ৭ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বিমানের এমডিসহ ৪ জনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
শুনানির সময় মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। বিকাল সোয়া তিনটায় শুনানি শুরু হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রুবেল মিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।
এরপর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়োজিত আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার রিংকি সহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষে। শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।
এক পর্যায়ে আদালত বিমানের সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিকে জিজ্ঞাসা করলে বীথিও শিশুটিকে নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।
এক পর্যায়ে আদালত শিশুর শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করেন। আদালত বলেন গত ৮ ফেব্রুয়ারি শিশু মোহনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের কাছে জবানবন্দি দেয়। তাকে হাসপাতাল থেকে আদালতে আনা হয়েছিল। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।
বর্ণনা থেকে দেখা যায়, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ভিকটিম ১১ বছরের শিশু মোহনাকে হাজির করা হলে তিনি তার শরীর পরীক্ষা করেন। দেখা যায় মোহনার, মাথা থেকে গলা পর্যন্ত নির্যাতনের ক্ষত। গরম খুন্তি দিয়ে মাথা থেকে গলা পর্যন্ত ছ্যাকা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ঘা হয়েছে। ঘা গুলো এখন সাদা হয়ে গেছে। তার হাতের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাকা দেওয়া হয়েছে। বাসের লাঠি দিয়ে পিটানো হয়েছে। মসলা বাটার সিল দিয়ে তার হাতের আঙ্গুলগুলো ছ্যাচা দেওয়া হয়েছে। মাথার চুল গুলো টেনে তোলা হয়েছে। মাথার চামড়াতে ক্ষত দেখা গেছে। পায়ের উরুতে গরম খুন্তির ছ্যাকা দেওয়া হয়েছে। শরীরের সর্বত্র ক্ষত চিহ্নগুলো দগদগে হয়ে গেছে। পায়ের পায়ের নখগুলো পচন ধরেছে।
আদালত পরে শিশু মোহনার জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান। জবানবন্দিতে মোহনা বলেছে, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করতেন ম্যাডাম বীথি। বাসার অন্যান্য সবাই তাকে মারধর করতেন। তার চুল টেনে টেনে তুলে ফেলা হতো। হাত, পিঠ, বুক, পেট, পা, উরু সর্বত্র তাকে গরম ছ্যাকা দেওয়া হতো। বাঁশের খুন্তি সব সময় রেডি থাকতো তাকে পেটানোর জন্য। অন্যান্য লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো হতো। তাকে বাথরুমে থাকতে দেওয়া হত। বাথরুমের পানি তাকে খেতে হতো। শীতের দিনে তাকে গরম কাপড় দেওয়া হতো না। বাথরুমের পানিতে থাকতে থাকতে তার পায়ের আঙ্গুল ও নখ পচন ধরেছে। চিকিৎসা করা হত না।
এপর্যন্ত বলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতকে জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ করেন। আইনজীবীরা বলেন আমরা এই নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা সহ্য করতে পারছি না। পরে আদালত রিমান্ডের বিষয়ে আদেশ দেন। সাফিকুর রহমানকে ৫ দিন, তাঁর স্ত্রী বীথিকে ৭ দিন এবং তাদের বাসার অন্য গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমকে ৬ দিন ও রুপালী খাতুনকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত আদেশে বলেন আগামী ১০ কার্য দিবসের মধ্যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে আদালতে হাজির করতে হবে।
আদালত বলেন, মামলার প্রধান আসামি বীথি শিশু নির্যাতনের মূলহোতা। তদন্ত কর্মকর্তার চাহিদা অনুযায়ী ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হলো। বাসার মালিক সাফিকুর রহমান শিশু নির্যাতনের দায় এড়াতে পারেন না। এ কারণে তাকে ৭ দিন রিমান্ড দেওয়া হল। অন্য গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের দুটি ছোট শিশু সন্তান রয়েছে। তারা সঙ্গে আছে। সেই বিবেচনায় তাকে পাঁচ দিন রিমান্ডে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। শিশু মোহনার জবানবন্দি থেকে দেখা যায়, আরেক দেহ কর্মী সুফিয়া বেগমও নির্যাতন করেছেন। এই বিবেচনায় তাকে ৬ দিন রিমান্ডে দেওয়া হল।
পরে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেন, তদন্ত ঠিকমতো করবেন। তদন্তে যেন কোনো ত্রুটি না হয়।
গৃহকর্মী মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা রিমান্ড শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা গত ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামালায় সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথি, বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পর গত ২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাফিকুর, তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com