দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাই বিদেশগামীদের দক্ষ করতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অধীন টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) গড়ে তুলেছে সরকার। কিন্তু দেশের মোট ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে অনেকগুলোর অধ্যক্ষ, উপধ্যক্ষসহ অন্যান্য কর্মকর্তা নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব বরাবর প্রতিনিয়ত অভিযোগ জমা পড়ছে। এরপর গঠন করা হচ্ছে একের পর এক তদন্ত কমিটিও। সেই আলোকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কাউকে দেয়া হচ্ছে গুরুদণ্ড, আবার কাউকে দেয়া হচ্ছে লঘুদণ্ড।
সর্বশেষ রংপুরের পীরগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মহিবুল ইসলামকে প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন (পিডিও) কোর্স পরিচালনায় অনিয়ম, পিডিও কোর্সের ক্লাস পরিচালনায় রিসোর্স পারসন নিয়োগ না করা, দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় বিদেশগমনেচ্ছুদের পিডিও কোর্সে ভর্তি দেখিয়ে প্রশিক্ষণ না দিয়ে আর্থিক সুবিধা ও সনদায়ন করাসহ নানা অভিযোগের সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধি অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে ‘তিরস্কার’ সুচক লঘুদণ্ড প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে কারণ দর্শাও নোটিশ ও শুনানিতে অংশ নিয়ে মহিবুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
গত ২৪ ডিসেম্বর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূইয়া স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য উল্লেখ করে আরো বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত শুনানিতে প্রদত্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য তদন্ত প্রতিবেদন, দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এবং নথির অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনায় অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. মহিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত সরকারি কর্মচারী বিধিমালা (শৃঙ্খলা ও আপিল) ২০১৮ এর ৩ (খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাকে তিরস্কার সুচক লঘুদণ্ড প্রদান করা হলো। এই দণ্ডাদেশ প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে এক বছর বলবৎ থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়। পীরগঞ্জ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: মহিবুল ইসলামের কাছে ইতোমধ্যে লঘুদণ্ডের শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
শুধু পীরগঞ্জের মো. মহিবুল ইসলামের বিরুদ্ধেই যে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে তা কিন্তু নয়, এর আগেও একাধিক টিটিসির অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) পাশ কাটিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংস্থায় অভিযোগ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের জানার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আইন বহির্ভূত কার্যক্রমের ব্যাখ্যাও তলব করা হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ জহিরুল আলম মজুমদার স্বাক্ষরিত গত বছরের ১৯ অক্টোবর একটি কৈফিয়ত তলব সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়েছিল কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চিফ ইনস্ট্রাক্টর (সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) আবু সৈয়দ মো. রেজাউল করিমের কাছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে জানানো যাচ্ছে, আবু সৈয়দ মো. রেজাউল করিম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, টিটিসি কুড়িগ্রাম কর্তৃক টিটিসি কুড়িগ্রামের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আইনুল হকের বিরুদ্ধে এক কোটি ৫২ লাখ ৯ হাজার ১৬৫ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতীত সরাসরি দুদক প্রধান কার্যালয়, ঢাকায় প্রেরণ করা হয়, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর দায়ে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৩(খ) অনুযায়ী আপনার কর্তৃক এহেন কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে অসদাচরণের দায়ে কেন আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম টিটিসি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই (আবু সৈয়দ মো. রেজাউল করিমের সময়ে) অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির ঘটনা নীরবে ঘটেছে বলে ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময় বিএমইটি এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করে আসছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো সেখানে অনিয়ম দুর্নীতি চলমান রয়েছে বলেও ভুক্তভোগী প্রশিক্ষণ নিতে আসা বিদেশগামী কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্ররা কর্তৃপক্ষের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করছেন। এই বিষয়েও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে টিটিসি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। রংপুর ও কুড়িগ্রাম টিটিসির পাশাপাশি চট্টগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একজন অ্যাকাউন্টস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তারই অফিস সহকর্মীদের সাথে অশোভন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরআগে অন্য দু’টি টিটিসিতে দায়িত্বে থাকার সময় সরকারি টাকা নয়-ছয় করার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত ও দণ্ড প্রদান করা হয়েছিল এরপর তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ) যুগ্ম সচিব মো. আশরাফ হোসেন বলেন, আমি যতদিন দায়িত্বে আছি ততদিন পর্যন্ত আমার অধীনস্থ কোনো টিটিসিতে যদি ট্রেনিং সংক্রান্ত কোনো অনিয়ম-দুুর্নীতিতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবো না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের কারণেই কিন্তু আমরা রেমিট্যান্সে স্বাবলম্বী। যাদের কারণে আমরা স্বাবলম্বী তাদের সাথে হয়রানি প্রতারণা করা হলে সেটি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সচিব স্যার এসব বিষয়ে খুবই সিরিয়াস। তিনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে সাথে সাথে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করছেন। তা ছাড়া যারা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বিষয়ে কোনো ছাড় নয় বলেও মন্তব্য করেছেন।
@dainikshiksha
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com