
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক শিল্পকারখানা, ইটভাটা, জুতার কারখানা, আইসক্রিম ফ্যাক্টরি কিংবা বেকারিতে দিনরাত চলছে পুরোদমে উৎপাদন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মব্যস্ততা, পণ্যের বহর, বিক্রির চাপ- সবই আছে। অথচ কর বিভাগের নথিতে নেই তাদের কোনো অস্তিত্ব। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের একটাই ‘নিয়ম’ প্রতি মাসে নগদে ম্যানেজ করা! কে নিচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে সেই টাকা, সবকিছুর বিস্তারিত মিলেছে যুগান্তরের হাতে আসা একটি গোপন তালিকায়। আর সেই তালিকা বলছে, কীভাবে একশ্রেণির রাজস্ব কর্মকর্তা রীতিমতো মাসোহারার বিনিময়ে ‘নীরব ছাড়পত্র’ দিয়ে যাচ্ছেন শত শত প্রতিষ্ঠানকে। ফলে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বছরে শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে, আর কর অফিসে গড়ে উঠেছে ঘুসের এক অপ্রতিরোধ্য রাজত্ব। তাদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন সহকারী কমিশনার রীমা আক্তার। তার ঘুস বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত দুই সার্কেলের কর্মকর্তা। তারা মাসে ৩০ লাখ টাকা ‘ঘুস’ আদায় করে থাকেন। কাস্টমস বিভাগের ভয়াবহ এই ঘুস বাণিজ্যের তথ্যপ্রমাণ নিউজ 247 এর হাতে এসেছে।
তথ্যানুযায়ী, জেলার বিভিন্ন শিল্পকারখানা, ইটভাটা, জুয়েলারি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, জুতার কারখানা, আইসক্রিম ফ্যাক্টরি, ফার্নিচার কারখানা ও বেকারিসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিমাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ঘুস নিচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (বিভাগীয় কর্মকর্তা) রীমা আক্তার। একটি তালিকায় ৩৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিমাসে ৯ লাখ টাকা ঘুস নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এছাড়াও জেলাসদর এবং বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিমাসে ঘুস লেনদেন হচ্ছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। রীমা আক্তার আখাউড়া স্থলবন্দরের কাস্টমসের সহকারী কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেও লাখ লাখ টাকা ঘুস বাণিজ্য করছেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জেলায় ১৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা সঠিকভাবে আদায় হলে রাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ হতো বলে মনে করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৯টি উপজেলার জন্য কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের বিভাগীয় কার্যালয়ের অধীনে দুটি কর সার্কেল রয়েছে। এর মধ্যে একটি সদর সার্কেল ও অপরটি নবীনগর সার্কেল। সদর সার্কেলের অধীনে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলাসহ নাসিরনগর, সরাইল ও বিজয়নগর উপজেলা এবং নবীনগর সার্কেলের অধীনে রয়েছে নবীনগরসহ আশুগঞ্জ, আখাউড়া, কসবা ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলা। এই দুটি কর সার্কেলের অধীন প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুস বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহ করেন সদর সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তা মংসাচিং মারমা ও বিভাগীয় কর্মকর্তা রীমা আক্তারের অফিসের অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর রাসেল। তারা পুরো জেলার সব প্রতিষ্ঠানের টাকা সংগ্রহ শেষে রীমা আক্তারের হাতে তুলে দিতেন। ঘুসের টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে মংসাচিং মারমা বলেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। রাজস্ব আদায় করতে গেলে আমাদেরকে তোপের মুখে পড়তে হয়। এ কারণে আগের মতো আমরা রাজস্ব আদায় করতে পারছি না। ঘুস লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করলে তিনি ঘাবড়ে যান এবং এ প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের তৎকালীন সহকারী কমিশনার রীমা আক্তার তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এরকম কোনো অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তার অফিসের কেউ এসব করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তার কাছে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ও রাজস্ব দেওয়া সব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এ প্রতিবেদক তথ্য চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পরপরই রিমাকে কাস্টমস হাউসে পানগাঁও তে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের কুমিল্লার বিভাগীয় তৎকালীন কমিশনারেট মো. মাহফুজুল হক ভূঁইয়া বলেছিলেন, রীমা আক্তারের বিরুদ্ধে এরকম অনৈতিক লেনদেনের খবর আমার জানা নেই। কেউ এসব করে থাকলে আর প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রিমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তাকে বদলি করে দেয়া হয়
©newss247.com
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com