শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি ধরার জন্য গঠিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তারাই এখন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নামে তারা নিয়মিত ঘুষ আদায় করছেন, যেখানে শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতনই ঘুষের রেট। ডিআইএ কর্মকর্তাদের এই পরিদর্শন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিচিত ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নামে। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের নথি, অডিও রেকর্ড ও অভিযোগ যাচাই করে দেখা গেছে, ডিআইএতে অন্তত ১৬ কর্মকর্তা মিলে গড়ে তুলেছেন ঘুষের সিন্ডিকেট। পরিদর্শন ও অডিটের নামে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এক মাসের বেতন নেওয়া হচ্ছে ঘুষ হিসেবে। কোথাও কোথাও দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকাও দাবি করা হয়েছে।
সূত্রমতে, গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডিআইএতে তিনজন পরিচালক পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আসেনি, বরং কিছু জায়গায় ঘুষের রেট বেড়েছে। ঘুষ লেনদেন বন্ধ করতে না পেরে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ পরিচালক সাইফুল ইসলাম পরিদর্শন সংখ্যা কমিয়ে কর্মকর্তাদের নজরদারির আওতায় আনতে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় মসজিদের ইমাম, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গদের সংযুক্ত করেন। নতুন পরিচালক শহিদুল ইসলামও একইভাবে নজরদারি করাচ্ছেন। তবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, অডিটের নামে ঘুষ-বাণিজ্য চলছেই।
কালবেলার অনুসন্ধানে সর্বশেষ ২০টি পরিদর্শন টিমের ওপর নজরদারি করা হয়। সেখানে প্রত্যেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কমবেশি ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে। এমন একটি প্রমাণ মিলেছে পটুয়াখালীর বাউফলে নওমালা ফাজিল মাদ্রাসায়। সেখানে শিক্ষকদের এক মাসের বেতন নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত পরিদর্শনকে ডিআইএ কর্মকর্তারা ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নাম দিয়ে এই ঘুষ-বাণিজ্য করছেন। ডিআইএ নথি বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ১১৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন হয়েছে। এর মধ্যে ৭০০ প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ এনেছে—এমন তথ্য দিয়েছে দপ্তরটির একজন কর্মকর্তা। সে হিসাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ৭ লাখ টাকা লেনদেন হলে ঘুষের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে পটুয়াখালী জেলার বাউফলের পশ্চিম নওমালা ফাজিল মাদ্রাসায় অডিটে যান পরিদর্শক ড. দিদারুল জামাল এবং অডিটর সিরাজুল ইসলাম। এই মাদ্রাসার ঘুষ লেনদেন ও টাকা তোলার একটি অডিও এসেছে কালবেলার হাতে। শুরুতে পরিদর্শক আশ্বস্ত করেন অডিটের জন্য কোনো ঘুষ দিতে হবে না। কিন্তু ঢাকা ফিরেই পাল্টে যায় চিত্র। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অডিটর সিরাজুল। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিবেদন নিতে হলে কর্মরত ৩০ জনের এক মাসের বেতন ঘুষ হিসেবে সাড়ে ৭ লাখ টাকা ধার্য করেন অডিটর। টাকার জন্য অধ্যক্ষকে চাপ দিতে থাকলে চলতি মাসের শুরুর দিকে সিরাজের কাছে প্রথম দফায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন অধ্যক্ষ। টাকা আদায়ের একটি অডিও রেকর্ড কালবেলার হাতে এসেছে। অডিওতে অধ্যক্ষকে বলতে শোনা যায়, যারা টাকা দেবেন তাদের ফাইল ডিআইএতে জমা হবে, যারা দেবেন না তাদেরটা পাঠানো হবে না। পরে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৭ জন শিক্ষক তাদের নিয়োগে কোনো সমস্যা নেই জানিয়ে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বিচার আকারে যায়।
কালবেলার হাতে আসা অন্য একটি অডিওতে শোনা যায়, শিক্ষকের উপস্থিতিতে একটি বৈঠকে অধ্যক্ষকে বলতে শোনা যায়, মিনিস্ট্রি অডিটে যারা আসেন তাদের এর আগেও এক মাসের বেতন দিতে হয়েছে, এবারও দিতে হবে। যদি কম লাগে, সেটি আপনারা ফেরত পাবেন। তবে এক মাসের বেশি কখনো তারা নেন না। অধ্যক্ষ আরও বলেন, এখন অডিটের অবস্থা খারাপ। আগে অডিটের প্রতিবেদন হাতে হাতে দিয়ে দিত। এখন ওয়েবসাইটে দিয়ে দেবে। তারা খারাপ রিপোর্ট দিলে ১০ ঘাটে দৌড়াতে হবে। শিক্ষা অফিস থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হবে। এসব কারণে মিনিস্ট্রি অডিটকে সবাই ভয় পায়।
পুরো অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইব্রাহিম হাবিব কালবেলাকে বলেন, ঘুষ দেওয়ার জন্য কোনো টাকা উঠাইনি। টাকা তোলার রেকর্ড থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কতজন কত কিছু বলতে পারে। আমি টাকা দেওয়ার জন্য কোনো চাপ দিইনি।
তবে ঘুষ দেওয়ার বিষয়টি কালবেলাকে জানিয়েছেন দুজন শিক্ষক। তারা বলেন, টাকা দিয়েও এখন সব জায়গায় অস্বীকার করতে হচ্ছে। কারণ ডিআইএ থেকে বলা হয়েছে, আপনারা টাকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলে খারাপ প্রতিবেদন দিয়ে দেব।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক দিদারুল জামান ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমি কোনো টাকা আনিনি, আপনি যা পারেন লিখে দেন। আর অডিটর সিরাজুল ইসলাম বলেন, টাকা তোলার জন্য আমি অধ্যক্ষকে বলিনি।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com