সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, করপোরেশন ও বিভাগের অনিয়ম-দুর্নীতি নিরীক্ষার উদ্যোগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেই। বিভিন্ন সময়ে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তরের নিরীক্ষায় ওসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি ঋণের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অর্থ লুট করা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত এক বছরে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত ও নিরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও এখনো দেখা যায়নি সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, করপোরেশন ও বিভাগের অনিয়ম-দুর্নীতি নিরীক্ষা করে দেখার কোনো উদ্যোগ। বর্তমানে দেশে ২৩২টি স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে ওসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ থেকে সেভাবে কোনো রিটার্ন পাচ্ছে না সরকার। বরং এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সরকারি কোষাগার থেকে দিতে হচ্ছে অর্থ। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে ৩০ জুন ২০২৪ শেষে ওসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ওসব প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তর এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। বিগত সরকারের শাসনামলে সরকারি বিনিয়োগকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য ক্রয়কৃত পণ্য ও সেবায় প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ওই অর্থ থেকে ঘুস হিসেবেই ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো চলে গেছে। রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগী ব্যক্তিরা ওই ঘুস নিয়েছেন। ওই সময়ে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ছিলো অনিয়ম ও লুটপাটের অন্যতম ক্ষেত্র। কিন্তু ওই খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, তিতাস গ্যাস ও বিপিডিবির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কোনো ধরনের তদন্ত কিংবা বিশেষ নিরীক্ষার অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নেয়নি।
সূত্র জানায়, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রকাশিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার অনিয়ম-দুর্নীতির কথা উঠে আসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কমিশন, কেন্দ্র না চালিয়ে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ ও অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে ওই অর্থ বেসরকারি খাত নিয়ে যাওয়ার কথা শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি কমাতে মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কমিটি করা হলেও আগের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অথচ বিগত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় শতাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সেব প্রকল্পে পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দিতে বড় আকারের কমিশন বাণিজ্য হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে। আর দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সংস্থাটি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে বিশেষ আইনের অধীনে বিগত দেড় দশকে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে। তবে ওসব ক্রয় চুক্তিতে বিভিন্ন সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আরো অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বড় আকারে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিগত সরকার পতনের পরই ওসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করার দাবি ওঠে।
Anti Corruption Movement (ACM)
House: 89 (5th fl), Road -3, Block-F, Banani, Dhaka – 1213, Bangladesh.
www.acmbangladesh.com
emailtoacm@gmail.com